বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি, কাসেম সোলাইমানির ভাস্কর্য ভেঙে উল্লাস!

গভীর অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে টানা বিক্ষোভে উত্তাল ইরান। চলমান আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাসের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।

ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ টানা ১২ দিন ধরে রাজপথে অবস্থান করছেন। এরই মধ্যে নির্বাসিত বিরোধী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে আন্দোলন ও ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

অর্থনৈতিক সংকট ও যুদ্ধের চাপ

দীর্ঘদিন ধরে আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সংকটে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

এর পাশাপাশি গত জুন মাসে ইসরাইলের সঙ্গে সংঘর্ষের ধকল সামলাতে হচ্ছে তেহরানকে। অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা মিলিয়ে ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব এখন চরম চাপে রয়েছে।

সরকারের কঠোর অবস্থান

কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতার জন্য ‘দাঙ্গাবাজ’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’র দায় চাপিয়েছে। দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান বিক্ষোভকারীদের বিচারের ক্ষেত্রে ‘কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

সরকারের এমন কড়া অবস্থান পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে আরও উত্তেজনা বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মানবাধিকার সংগঠনের অভিযোগ

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “১০ দিনের বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভ দমন করতে অবৈধ বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বিক্ষোভকারী ও সাধারণ পথচারী নিহত ও আহত হয়েছেন।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।

কাসেম সোলাইমানির ভাস্কর্য ভাঙচুর

চলমান অস্থিরতার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একটি ভিডিও, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA) প্রকাশিত ওই ভিডিওতে দেখা যায়, দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশের কুহচেনার শহরে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলাইমানির একটি ভাস্কর্য ভেঙে উল্লাস করছেন বিক্ষোভকারীরা।

এই ঘটনা ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ

এইচআরএএনএর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ৩১টি প্রদেশের সবগুলোতেই মোট ৩৪৮টি স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানী তেহরান ছাড়াও বিভিন্ন বড় শহর ও প্রাদেশিক এলাকাতেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে।

এতে করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চাপ আরও বেড়েছে এবং সরকারের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠছে।

বিরোধী নেতার আহ্বান

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র ও প্রভাবশালী নির্বাসিত বিরোধী নেতা রেজা পাহলভি বুধবারের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকে এই আন্দোলনের জন্য ‘অভূতপূর্ব’ বলে উল্লেখ করেন।

তিনি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বড় পরিসরে নতুন বিক্ষোভ আয়োজনের আহ্বান জানান, যা সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ভর্তুকি সংস্কার ও সরকারের বার্তা

চলমান অস্থিরতার মধ্যেই ভর্তুকি সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে তেহরান। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বৃহস্পতিবার দেশীয় সরবরাহকারীদের পণ্য মজুতদারি ও অতিরিক্ত দাম নেওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “পণ্যের সরবরাহ ও বিতরণ নিয়ে জনগণের মধ্যে কোনো ধরনের ঘাটতির অনুভূতি থাকা উচিত নয়।”

banner

সংকট কোন পথে?

অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমননীতি— সব মিলিয়ে ইরান এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত না হলে এই আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।