ইরানের বিক্ষোভে ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগান, সরকারি ভবনে আগুন

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আরও জোরদার রূপ ধারণ করেছে। টানা আন্দোলনের চাপে গভীর সংকটে পড়েছে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে সহিংসতার খবর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরাসরি রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা খামেনির পদত্যাগের দাবি তুলছেন এবং সরকারবিরোধী স্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে তুলছেন।

‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগানে উত্তাল তেহরান

সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা গেছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাতে তেহরানের কুদস স্কয়ারে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীরা ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দিচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই স্লোগান ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ।

সরকারি ভবনে আগুন, বিক্ষোভকারীদের উল্লাস

চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যেই পূর্ব তেহরানে একটি সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ভবনটিকে আগুনে জ্বলতে দেখা যায়।

এ সময় আশপাশে থাকা বিক্ষোভকারীরা উল্লাস প্রকাশ করেন। ঘটনাটি আন্দোলনের সহিংস রূপ নেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

নিরাপত্তা বাহিনীর গুলির অভিযোগ

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, চলমান বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাসের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি ব্যবহার করেছে।

এতে বিক্ষোভকারী ছাড়াও সাধারণ পথচারী হতাহত হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

অর্থনৈতিক সংকট ও যুদ্ধের চাপ

বহু বছর ধরে আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

এর পাশাপাশি গত জুন মাসে ইসরাইলের সঙ্গে সংঘর্ষের ধকল সামলাতে হচ্ছে সরকারকে। অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ মিলিয়ে বর্তমান নেতৃত্ব গভীর সংকটে পড়েছে।

সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারি

ইরানের কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতার জন্য ‘দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করেছে। দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান বিক্ষোভকারীদের বিচারের ক্ষেত্রে ‘কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

সরকারের এই কড়া অবস্থান পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে বলে মত বিশ্লেষকদের।

বিরোধী নেতা রেজা পাহলভির আহ্বান

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র ও প্রভাবশালী নির্বাসিত বিরোধী নেতা রেজা পাহলভি বুধবারের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকে এই আন্দোলনের জন্য ‘অভূতপূর্ব’ বলে উল্লেখ করেন।

তিনি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বড় পরিসরে নতুন বিক্ষোভ আয়োজনের আহ্বান জানান, যা সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

অ্যামনেস্টির উদ্বেগ

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “১০ দিনের বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভ দমন করতে অবৈধ বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বিক্ষোভকারী ও সাধারণ পথচারী নিহত ও আহত হয়েছেন।”

কাসেম সোলাইমানির ভাস্কর্য ভাঙচুর

মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA) প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশের কুহচেনার শহরে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলাইমানির একটি ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে উল্লাস করছেন বিক্ষোভকারীরা।

এই ঘটনা শাসকগোষ্ঠীর প্রতীকের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন ও প্রাণহানি

এইচআরএএনএর হিসাব অনুযায়ী, ইরানের ৩১টি প্রদেশের সবগুলোতেই মোট ৩৪৮টি স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে।

অন্যদিকে, স্থানীয় গণমাধ্যম ও সরকারি সূত্রের বরাতে সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি।

banner

সংকট কোন পথে?

ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, রাজনৈতিক দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমননীতি এবং ব্যাপক গণঅসন্তোষ— সব মিলিয়ে ইরান এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে।

পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এই আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে বড় ধরনের পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।