হাদি হত্যা মামলায় নাটকীয় মোড়: নতুন তদন্তে সিআইডি
আদালত প্রতিবেদক | ১৫ জানুয়ারি

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার তদন্তে নাটকীয় মোড় সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কর্তৃক দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে ‘মূল রহস্য’ আড়াল করা হয়েছে—এমন অভিযোগে মামলার বাদীর করা নারাজি আবেদন মঞ্জুর করে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এই আদেশ দেন। এর আগে সকালে মামলার বাদী এবং ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের আদালতে নারাজি আবেদন দাখিল করেন। আবেদনটি ঘিরে দীর্ঘ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বাদীপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ উভয়েই তাদের যুক্তি উপস্থাপন করেন।

ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের ডিসি মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান জানান, আদালত মামলাটি পুনঃতদন্ত করে আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে সিআইডিকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।

ডিবির তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

আদালতে শুনানিকালে বাদীপক্ষের আইনজীবী ডিবি পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, হাদি হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন না করেই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে, যা মামলার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

ডিবির তদন্ত প্রতিবেদনে একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে এই হত্যাকাণ্ডের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বাদীপক্ষের দাবি, এত সুপরিকল্পিত ও বড় পরিসরের একটি হত্যাকাণ্ড কেবল একজন কাউন্সিলরের পক্ষে সংঘটিত করা বাস্তবসম্মত নয়। এর পেছনে আরও প্রভাবশালী ও সংগঠিত কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

আর্থিক লেনদেন ও নেপথ্য শক্তির ইঙ্গিত

বাদীপক্ষের আইনজীবী আরও উল্লেখ করেন, মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ফয়সাল করিমের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেননি। এই আর্থিক লেনদেনের উৎস, উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য সম্পর্ক অনুসন্ধানে ডিবি পুলিশের গাফিলতি ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়।

একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা হয়—একজন অপেশাদার ব্যক্তি কীভাবে এত নিখুঁতভাবে একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে পারে, সে কার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছে কিংবা কার মদতে এই অপরাধে জড়িয়েছে। চার্জশিটে এসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা না থাকায় তদন্তের নিরপেক্ষতা ও গভীরতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

সহযোগীদের ভূমিকা নিয়েও অস্পষ্টতা

বাদীপক্ষ আরও দাবি করে, হত্যার পর খুনিকে পালাতে যারা সহযোগিতা করেছে, তাদের প্রকৃত পরিচয়, স্বার্থ এবং সংশ্লিষ্টতা চার্জশিটে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে করে হত্যাকাণ্ডের পুরো চিত্র আদালতের সামনে উঠে আসেনি।

চার্জশিট ও আদালতের সিদ্ধান্ত

উল্লেখ্য, গত ৬ জানুয়ারি ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম ১৭ জনকে আসামি করে এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার চার্জশিট জমা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। পরে ১২ জানুয়ারি বাদীপক্ষ চার্জশিট পর্যালোচনার জন্য সময় চাইলে আদালত আজকের দিনটি ধার্য করেন।

দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ, শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর আদালত মনে করেন, ডিবি পুলিশের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উপেক্ষিত হয়েছে। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ডিবির পরিবর্তে সিআইডিকে পুনরায় তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

banner

মামলার এই নতুন মোড়কে ঘিরে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এখন সবার দৃষ্টি সিআইডির তদন্তের দিকে—এই পুনঃতদন্তে আদৌ কি হাদি হত্যার প্রকৃত নেপথ্য উন্মোচিত হবে, নাকি আরও নতুন প্রশ্ন সামনে আসবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।